বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, যেকোনো মূল্যে দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় রাখতে হবে। মতপার্থক্য থাকবে তবে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। আমাদের সবার মনে রাখতে হবে, মতপার্থক্য যেন মতবিরোধে পরিণত না হয়। তিনি বলেন, বিগত সরকারের আমলে মতবিরোধের বাজে দৃষ্টান্ত দেখেছে দেশ। কাজেই। ১৯৭১, ৯০ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অর্জন সামনে রেখে সবাই মিলে কাজ করলে দেশ এগিয়ে যাবে। হিংসা প্রতিশোধের পরিণতি কি হতে পারে, সেটা আমরা দেখেছি ২০২৪, ৫ আগস্ট। তাই আমরা ৫ আগস্টের আগের পরিস্থিতিতে ফিরতে চাই না। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে আর কোনো প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধের রাজনীতি দেখতে চান না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, তবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিভেদ দূর করে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখাই সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে মতপার্থক্য ভুলে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সবাই মিলে কাজ করতে হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশ গণতন্ত্রের দিকে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানীস্থ হোটেল শেরাটনের বলরুমে সাংবাদিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েই সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন বিএনপির চেয়ারম্যান। এ সময় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার সঙ্গে ছিলেন।তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ৫ আগস্টের আগে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখছে, সকল আশা হয়তো পূরণ করা সম্ভব নয়, তবে সবাই যদি স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য কাজ করি তাহলে জাতিকে সঠিক পথে নিয়ে যেতে পারবো।দেশে না থাকলেও সারাক্ষণ মন ছিল দেশের সঙ্গেই: তারেক রহমান বলেন, আমি দেশে না থাকতে পারলেও সারাক্ষণ যোগাযোগ রেখেছি। সবার তথ্য রাখার চেষ্টা করেছি। গত ১৬ বছরে সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের কথা আমি জানি। পাশপাশি আমার নেতাকর্মী এবং আমার মা নির্যাতনের শিকারের বড় উদাহরণ। জাতিকে সঠিকপথে পরিচালিত করার প্রত্যাশা: বিএনপি সরকার গঠন করলে জাতিকে সঠিকপথে পরিচালিত করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, আমাদের সমস্যা ছিল, আমাদের সমস্যা আছে। ঐক্যবদ্ধভাবেই দেশের সকল সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।তিনি আরও বলেন, আমি আমার অবস্থান থেকে যদি চিন্তা করি আমার এক পাশে ১৯৮১ সালের একটি জানাজা; একই সাথে আমার এক পাশে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের একটি জানাজা; আর আমার আরেক পাশে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের একটি ঘটনা। কাজেই আমার মনে হয় এটি শুধু বোধহয় আমার একার জন্য নয়, যারা আমার দলের নেতাকর্মী সদস্য এবং সামগ্রিকভাবে পুরা দেশের মানুষের সামনে এই দুটি উদাহরণ বোধহয় সবচাইতে বাদ বিবেচনা করার জন্য সবচাইতে ভালো উদাহরণ যে আসলে ৫ আগস্টের আগে ফিরে যাওয়ার কোনোই কারণ নেই আমাদের।বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, মতবিভেদ হলে, বিভেদ হলে জাতিকে বিভক্ত করে ফেললে কী হতে পারে আমরা দেখেছি। আজকে সেজন্যই অনেকের মুখে অনেক হতাশার কথা আমরা শুনি; কিন্তু তার পরও আশার কথা হচ্ছে যে, তাদের কাছে ভবিষ্যতের চিন্তাও আছে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আছে।তিনি বলেন, আমার দেশে ফিরে আসার পরে আমি যে কয়বার আমার বাইরে যাওয়ার একটু বেশি সুযোগ হয়েছে, আমি সাভারে গিয়েছিলাম, আরও কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে নতুন প্রজন্ম একটি গাইডেন্স চাইছে, নতুন প্রজন্ম একটি আশা দেখতে চাইছে। শুধু নতুন প্রজন্ম নয়, আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রত্যেকটি প্রজন্মই মনে হয় কিছু একটি গাইডেন্স চাইছে। আমরা যারা রাজনীতিবিদ করি, আমাদের কাছে হয়তো অনেক প্রত্যাশা; সকল প্রত্যাশা হয়তোবা পূরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা রাজনীতিবিদরা যদি ১৯৭১ সাল, ১৯৯০ সাল, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট এই সবগুলোকে আমাদের সামনে রেখে আমরা যদি দেশের স্বাধীনতা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য কাজ করি, তাহলে নিশ্চয়ই আমার কাছে মনে হয়, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা জাতিকে একটি সঠিক ডাইরেকশনে নিয়ে যেতে সক্ষম হব।কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি কার্ড চালুর ভাবনা: তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি কার্ড চালুর ভাবনা রয়েছে। দেশে দেড় কোটির মতন কৃষক আছেন। এত বিশাল সংখ্যক মানুষ- যারা ২০ কোটি মানুষের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করছে, খাওয়ার-অন্নের সংস্থান করছে সেই এত বড় সমাজটাকে কীভাবে সাপোর্ট দেওয়া যায়। তাদের হয়তো সেভাবে বলার সুযোগ নেই। এখানে আপনারা সংবাদপত্রের যারা কর্মী আছেন, আপনারা আপনাদের কিছু সমস্যার কথা বলেছেন। আপনাদের সমস্যাটা আমাদের জন্য শুনতে জানতে সহজ হয় বিকজ আমাদের জন্য একটা ভেন্যু আছে, যেখানে আমরা আলাপ করতে পারি। কিন্তু ওই কৃষকগুলো যাদের কোনো ভেন্যু নেই যারা এরকম একটা প্রোগ্রাম অর্গানাইজ করতে পারছে না তারা কীভাবে বলবে কথাগুলো। কাজেই তাদের কথা তো আমাদের জানতে হবে।দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর অবদানের কথা তুলে ধরে তার বড় ছেলে তারেক বলেন, মরুহুমা বেগম খালেদা জিয়া নারীদের শিক্ষার ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছিলেন। পরবর্তীতে আগামী নির্বাচনে ইনশাল্লাহ জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে: এই নারীরাই শিক্ষিত হয়েছে, এদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা।৪ কোটি পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু প্রস্তাব: দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের জন্য একটি যুগান্তকারী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর প্রস্তাব দেন তারেক রহমান। এই পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে থাকবেন পরিবারের গৃহিণীরা। সেটির লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেটাই এই নারী সমাজকে গড়ে তোলা। আমাদের হিসাব মতে বাংলাদেশে ৪ কোটি ফ্যামিলি আছে। আমরা যদি পরিবার হিসেবে ভাগ করি, এভারেজে একটি পরিবারে ৫ জন করে সদস্য ধরা হয়েছে। কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারের গৃহিণী ৫ থেকে ৭ বছর আর্থিক বা খাদ্য সহায়তা পাবেন বলে জানান তিনি।তারেক রহমান বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে নারীদের হাতে অর্থ থাকলে তা মূলত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যয় হয়, যা পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। তিনি আরও জানান, এই সুবিধা হবে সর্বজনীন, যাতে দলীয় পরিচয় বা শ্রেণিবিভাগের কারণে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা বৈষম্যের সুযোগ না থাকে। স্বাস্থ্যখাতে ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ ও নতুন কর্মসংস্থান: স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে উন্নত বিশ্বের আদলে ‘প্রিভেনশন’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দেন বিএনপির চেয়ারম্যান।তিনি বলেন, জনগণকে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সচেতন করতে প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। এই স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ হবেন নারী। তারা ঘরে ঘরে গিয়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবেন। এর ফলে একদিকে জনস্বাস্থ্য উন্নত হবে, অন্যদিকে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, একটি বড় সমস্যা হচ্ছে হেলথ ইস্যু। বাংলাদেশে ২০ কোটি মানুষ। আমরা স্লোগান দিয়ে হয়তো বলতে পারি যে, ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করব, আমরা সকলকে স্বাস্থ্য সুবিধা দেব। যেকোনো ধরনের সেটি বাইপাস হোক, কার্ডিয়াক হোক, ক্যান্সার হোক, সবরকম চিকিৎসা ইউকে দেয়। এখন আমরা কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে, এই কাজটা করতে গিয়ে ইউকের মতন দেশগুলো ইউরোপের যে ডেভেলপ দেশগুলো আছে তারা হিমশিম খাচ্ছে। তারা এখন যেটাতে চাচ্ছে সেটা হচ্ছে প্রিভেনশন। কিন্তু যদি প্রিভেনশন করা হয়, মানুষকে যদি সচেতন করা হয় যে, এই এই খাবারগুলো খেও না, তাহলে তুমি কিডনি প্রবলেম হবে না। এই খাবারগুলো খেও না, তাহলে তোমার হার্ট প্রবলেম হবে না। এই খাবারগুলো খেও না, তাহলে তোমার ডায়বেটিক হবে না। মানুষকে যদি এভাবে সচেতন করা যায় তাহলে দেখা গেছে, তাতে রাষ্ট্রের খরচ অনেক কমে আসে, মানুষও সুস্থ থাকে। এবং এটার উপর বেস করে যেহেতু ইউরোপেই এই কাজটা চলছে, এটার ওপর বেস করে আমরা হেলথ কেয়ারার অ্যাপয়েন্ট করতে চাই।নারীদের নিরাপত্তা বিষয়ে এক নারী সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, শুধু নারীর নয়- নারী ও পুরুষ সবারই নিরাপত্তা প্রয়োজন।তিনি বলেন, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যা অস্বাভাবিক। কোনো বছর কম, কোনো বছর বেশি হলেও এমন ঘটনা কেন ঘটছে-তা নিয়ে রাজনীতিবিদদের গভীরভাবে ভাবা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।দেশের পানি দূষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একের পর এক নদী দূষণ হচ্ছে। এর সমাধান নিয়ে সংসদে এবং সেমিনারে আলোচনা হওয়া উচিত।সাংবাদিকদের কাছে গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যাশা করে তারেক রহমান বলেন, আমরা ইনশাল্লাহ দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে যাতে আপনাদের কাছ থেকে আপনাদের কাছ থেকে এমন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা আমরা পাই, যেটা আমাদেরকে সাহায্য করবে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। শুধু সমালোচনা- সমালোচনা করার জন্য নয়। আপনাদের কাছ থেকে এমন সমালোচনা আমরা পাই, যাতে আমরা দেশের মানুষের যে সমস্যাগুলো আছে- সেই সমস্যাগুলো যাতে আমরা সমাধান করতে সক্ষম হই।অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দসহ সম্পাদক ও সিনিয়ির সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।ভোরের আকাশ/এসএইচ
১ সপ্তাহ আগে
আর মাত্র ৩৩ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার প্রতিযোগিতায় ভোটের মাঠে রয়েছে দুটি রাজনৈতিক জোট। একটি হলো দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আর অন্যটি হলো জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে তেমন একটা সংকট পরিলক্ষিত না হলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে রয়েছে জটিল সংকট। তবে সংকট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে দলগুলোর সূত্রে জানা গেছে।সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, নির্বাচনী আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করতে ১১ দলের নেতাদের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। শুরুতে আসন সমঝোতা নিয়ে ১১ দলীয় জোটের অসন্তোষ থাকলেও নানামুখী আলোচনার পর এখন তা কিছুটা নমনীয় হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে জোটের সঙ্গী একাধীক দলের নেতা জানিয়েছেন। নির্বাচনী মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বধীন ১১ দলীয় জোট অথবা আসন ভিত্তিক সমঝোতায় রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পূর্বে সমঝোতা আসতে না পারায় জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে দলীয় প্রার্থী দেয়। পাশাপাশি এনসিপি ৪৭টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি, খেলাফত আন্দোলন ১১টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। তবে এনসিপির একটি আসনের মনোনয়ন পত্র যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হয়। কাজেই এনসিপির মনোনয়ন বৈধ হয় ৪৬টি। নির্বাচনী আসন সমঝোতায় প্রথমে ছিল আটটি রাজনৈতিক দল। পরে এই সমঝোতায় যুক্ত হয় এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি। একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে আট দলের আলোচনায় ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনের দাবি তোলে। অন্য দলগুলোর দাবিও ছিল তুলনামূলক বেশি। তবে শেষ মুহূর্তে এনসিপি, এলডিপি ও এবি পার্টি যুক্ত হলে ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের মধ্যে আসনসংখ্যা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। এনসিপির সূত্রে যে তথ্য পাওয়া গেছে, ১১-দলীয় নির্বাচনী সমঝোতায় এনসিপিকে ৩০টি আসনে জামায়াত ছাড় দেবে-এমন আলোচনা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, এনসিপির ৪৪টি আসনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। তবে এনসিপি ৩৫ থেকে ৪০টি আসন চাইছে। তবে সেগুলোর বেশির ভাগ আসনেই জামায়াতের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। অন্যদিকে এবি পার্টির সঙ্গে তিনটি আসনে সমঝোতা করতে চায় জামায়াত। তবে এবি পার্টি মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে ৫৩টি আসনে। এ প্রসঙ্গে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আট দলের সঙ্গে এখনো এবি পার্টির আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। শুধু জামায়াত নেতাদের সঙ্গে এবি পার্টি ও এনসিপির আলাদা বৈঠক হয়েছে। সমঝোতার আলোচনা চলমান রয়েছে। তবে, এবি পার্টির মতে, আসন সমঝোতা এখনো স্পষ্ট নয়।বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের এক সূত্রে জানা গেছে, দলটির লক্ষ্য ২৫-৩০টি আসন। ইতোমধ্যে ১১টি আসন ছাড় দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কাঙ্খিত আসনে ছাড় না পেলে সমঝোতা না হওয়া অবশিষ্ট আসনে দলীয় প্রতীকে তাদের প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন।এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, সমঝোতার ধরন যা-ই হোক, নির্ধারিত কিছু আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস অবশ্যই রিকশা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। মামুনুল হক বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে আগের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। তবে সবার মধ্যে নমনীয় মনোভাব দেখা গেছে। সমঝোতার আলোচনা তিন-চার দিনের মধ্যে একটা পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।এলডিপি সূত্রে জানা গেছে, ১১ দলীয় জোটে ২ আসনে সমঝোতা হলেও কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবীক্রমের নেতৃত্বাধীন এলডিপি ২৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছে। আসন সমঝোতা নিয়ে এলডিপির তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। ইসলামী আন্দোলনে অসন্তোষ : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সূত্রে জানা গেছে, জোটের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩৫ টি আসন দেওয়ার কথা উঠেছে। তবে এতো কমসংখ্যক আসনে নিয়ে নির্বাচন করতে নাখোশ দলটির নেতাকর্মীরা। দলীয় সূত্রগুলো জানায়, ৩০০ আসনের মধ্যে ২৭২টি আসনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে দলটি। দলটি জোটের ভেতরে আসন বণ্টন নিয়ে শক্ত অবস্থান থেকে দর কষাকষি করতে চায় কিংবা এককভাবে নির্বাচন করে নিজেদের রাজনৈতিক সক্ষমতা আলাদাভাবে প্রমাণ করতে আগ্রহী।ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম দাবি করেন, তাদের দল ১৪৩টি আসনে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে, কিন্তু সে অনুযায়ী সমঝোতা হচ্ছে না। ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের একটি অংশের ধারণা, জামায়াত এনসিপিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সমঝোতায় এনসিপিসহ নতুন তিনটি দল যুক্ত হওয়ায় আসন ছাড়ের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে হচ্ছে। এতে আগে যত আসনে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে সংখ্যা কমাতে হচ্ছে। এ নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের পাশাপাশি কয়েকটি দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় জামায়াতের তৃণমূলেও অসন্তোষের কথা শোনা যাচ্ছে। তবে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর মুখপাত্র ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের দাবি, আসন নিয়ে কোনো দাবি নাই তাদের। তিনি বলেন, আমাদের কোনো দাবি নাই। আলোচনায় যৌক্তিকভাবে আমরা কিছু ক্রাইটেরিয়া ঠিক করছি। সেটার আলোকেই সমঝোতা সমন্বয় হবে। অন্যদিকে জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ইসলামী আন্দোলন ৭০-৭৫টি আসন চাইছে, যেটি বাস্তবসম্মত নয়। এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের ইন্ধন আছে কি না, সেটিও ভাবা দরকার। অতীতের নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হয়েছে। আগামী নির্বাচন কেন্দ্র করেও একই রকম ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যারা ইসলামী দলগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে দেখতে চায় না, তারাই এসব ষড়যন্ত্র করছে। এছাড়া, খেলাফত মজলিস ২৫টিরও বেশি আসন চেয়েছিলো। কিন্তু তিনটি আসন নিয়েই তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাদের। আর আসন সমঝোতায় পিছিয়ে নেজামে ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলন মাত্র দুইটি করে আসন নিশ্চিত করতে পেরেছে যা বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। তবে ৩০০ আসনের মধ্যে বিডিপি এবং জাগপার ক্ষেত্রেমাত্র একটি করে আসন ছাড় দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।দলীয় সূত্র জানায়, সর্বশেষ বৈঠকের পর ইসলামী আন্দোলনকে ৩৫ থেকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি, খেলাফত মজলিসকে ৩টি, এবি পার্টিকে ৩টি, এলডিপিকে ৭টি এবং বিডিপিকে ১টি আসন ছাড়ের কথা বলে জামায়াত ইসলামী। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলন একপর্যায়ে সমঝোতার আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। সূত্রে মতে, ১১ দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আকাঙ্খিত সংখ্যায় আসন না পাওয়ায় এই জোটের পুরাতন সঙ্গী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দলের অসন্তোষ যেমন রয়েছে, তেমনি জোটের প্রার্থীদের আসন দিতে গিয়ে বিভিন্ন আসনে জামায়াতে ইসলামীর নিজ দলের নেতা-কর্মীদেরও মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নেতারা। আসন সমঝোতার বাইরে, এই জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ দুই দলের মধ্যে অনেকটা নীরব যুদ্ধও চলছে।দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সমঝোতা সিদ্ধান্তে বিলম্ব এবং আপাতত যেসব আসনে সমঝোতার সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো নিয়ে মাঠ পর্যায়ের অসন্তোষ বেশ প্রকট। আসন নিয়ে দলগুলোর নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় এমন সমঝোতা সংকট দেখা দিয়েছে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ছাড় দিয়ে হলেও আলোচনার মাধ্যমে কোনো একটা সমাধান আসা এখনই উপযুক্ত সময়। অন্যথায় সমঝোতার প্রক্রিয়াটিই একটি সংকটে পরিণত হবে। যা ভোটের মাঠে জয় পেতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে দলগুলোর প্রার্থীদের-এটাই ভাবছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, জামায়াতে ইসলামীর নিজেদের শক্তি বাড়াতেই জোট। যাদের সাথে জোট করেছে তাদেরও একক শক্তিতে কিছু করার নাই। পরস্পরই পরস্পরকে ব্যবহার করছে নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী। সুতরাং এখানে একটা স্বার্থের সংঘাত হলেই জোট ভেঙে যাবে। তিনি মনে করেন, আদর্শগত কোনো জায়গা না থাকার কারণে এ ধরনের জোট বেশি দিন টেকে না। ফলে আসন নিয়ে সমঝোতা সম্পর্কিত স্বার্থগত দ্বন্দ্বের কারণেই নির্বাচনের আগেই এই জোট ভেঙে যেতে পারে অথবা নির্বাচনের পরে তা ভেঙে যেতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।ভোরের আকাশ/র.ই
১ সপ্তাহ আগে
আর মাত্র ৩৪ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। দীর্ঘ ১৭ বছর যে অধিকার বঞ্চিত হয়েছিল, সেই অধিকার ফিরে পাওয়ার দিনটির অপেক্ষায় দেশের ১৮ কোটি মানুষ। জনগণের ইচ্ছায়, সুষ্ঠু ভোটের মধ্যদিয়ে একটি জবাবদীহি সরকার গঠন হবে এবং দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে-এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। কাজেই অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহনযোগ্য ভোট আয়োজনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতির ইতিহাসে একটি সেরা নির্বাচন উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্ন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস। এ লক্ষে সরকারের উর্ধ্বতন মহল, প্রশাসন ও ইসি দিনরাত কাজ করছেন বলে ইসি সূত্রে জানা গেছে। এমনকি সকল শঙ্কা দূর করে শান্তিপূর্ন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট আয়োজনে অঙ্গীকার ইসির। তবে নির্বাচন সুষ্টু না হওয়ার শঙ্কা দেখছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরির পার্টি (এনসিপি) ও কয়েকটি ইসলামী দল।সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষে সংসদ নির্বাচনে কঠোরভাবে আচরণবিধি প্রতিপালন ও অনিয়ম রোধে মাঠ পর্যায়ে ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম, নির্বাচন মনিটরিং টিম এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল গঠিত হচ্ছে ইসির নিদের্শনা অনুযায়ী। পাশাপাশি আইন শৃঙ্খলা বিষয়ে কমিশনের সাথে গত রোববার সকল বাহিনী প্রধানদের এবং সংস্থা প্রধানদের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে তিন বাহিনী প্রধান তথা সেনাবাহিনী প্রধান, নৌবাহিনী প্রধান এবং বিমান বাহিনী প্রধানের সাথে আলাদাভাবে মিটিং করেছে। সুষ্ঠু ভোট সম্পন্ন করই মূল টাগের্ট নিয়ে আলোচনা হয় ঐ বৈঠকে। নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী সব কাজ যেন নির্বিঘ্ন হতে পারে সে নির্দেশনা রয়েছে বৈঠকে। কাজেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে যৌথ বাহিনী।যৌথ বাহিনীর অভিযানের মূল লক্ষ্য তিনটি। ১. অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার: নির্বাচন সামনে রেখে যে অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ আছে, সেগুলো উদ্ধার করা। যেগুলোকে উদ্ধার করা সম্ভব না, সেগুলো যেন কোনো অপকর্মে ব্যবহৃত না হয়। ২. চিহ্নিত সন্ত্রাসীদেরকে গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় নিয়ে আসা। ৩. নির্বাচনকেন্দ্রিক দল এবং প্রার্থীর যে আচরণবিধি আছে, সেই আচরণবিধির বড় কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তা যৌথ বাহিনী দেখবে।সুষ্ঠু, গ্রহনযোগ্য ও নিরপেক্ষ ভোট আয়োজন প্রসঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, দেশে কোনো পাতানো নির্বাচন হবে না। নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়েও আমরা শঙ্কিত নয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করবে কমিশন।মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপিল কর্তৃপক্ষ হিসেবে সর্বোচ্চ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে নির্বাচন কমিশন। রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনো মনোনয়নপত্র গ্রহণ বা বাতিল করলে, উভয় ক্ষেত্রেই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ইনসাফে বিশ্বাসী। আমরা ইনসাফ করব। শুনানি শেষে আপনারা দেখবেন, আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী ন্যায়বিচার করা হয়েছে। আইন সবার জন্য সমান এবং সবাই তা মানতে বাধ্য। সিইসি বলেন, আগের মতো এবার কোনো পাতানো নির্বাচন হবে না। যারা আবেদন করছেন আইনি ভিত্তিতে তা সমাধান করা হবে।নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।তিনি বলেন, নির্বাচনে কঠোরভাবে আচরণবিধি প্রতিপালন ও অনিয়ম রোধে মাঠ পর্যায়ে ‘ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম’, ‘নির্বাচন মনিটরিং টিম’ এবং ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল’ থাকবে।ইসি সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে রিটার্নিং অফিসাররা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছেন। পরিপত্রে বলা হয়, নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম রোধে বিভিন্ন কমিটি গঠন ও তাদের কার্যপরিধি নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন। আইন, বিধিমালা ও প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করে এসব কমিটি দায়িত্ব পালন করবে, যাতে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে রিটার্নিং অফিসারদের জন্য কয়েকটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।এর মধ্যে রয়েছে-(ক) বিশেষ কোনো মহলের কোনো প্রকার প্রভাব বা হস্তক্ষেপে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা যেন ক্ষুন্ন না হয় তা আইন, বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালার আলোকে নিশ্চিত করতে হবে। (খ) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এমন কোনো কাজ করবেন না যেন তারা কর্তৃপক্ষ বা জনগণের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হন। (গ) জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে এলাকার জনগণের যৌথ সভা করে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখতে হবে। (ঘ) ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে আসা ও নিরাপদে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভ্রাম্যমাণ ইউনিটকে নিবিড় টহল দিতে হবে। (ঙ) ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং যেকোনো প্রকার অশুভ কার্যকলাপ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে সদা সতর্ক থাকার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দিতে হবে। (চ) ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর কেন্দ্রগুলোর অবস্থান সম্পর্কে নির্বাচনের আগে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম গঠন ও কাজ: সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা পর্যায়ে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে এই টিম গঠন করা হবে। এতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা এবং বেসরকারি পর্যায়ের নির্দলীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সদস্য হিসেবে থাকবেন। এই টিমের প্রধান কাজ হচ্ছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫ যথাযথভাবে মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা সরেজমিনে দেখা। নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করছে কি না তা তদারকি করা। আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা নজরে আসলে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি তদন্ত কমিটিকে জানানো। নির্বাচনি বিধি-নিষেধ ভঙ্গের ক্ষেত্রে মামলা দায়ের ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। নির্বাচনি এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিনের প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে পাঠানো।আচরণবিধি অবহিতকরণ: সব প্রার্থী, রাজনৈতিক দল ও তাদের এজেন্টকে আচরণবিধি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। বিধি ভঙ্গের শাস্তি, বিশেষ করে প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।নির্বাচন মনিটরিং টিম: তফসিল ঘোষণার পর রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে মনিটরিং টিম গঠন করতে হবে।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল গঠন: নির্বাচনি এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল গঠন হবে। এতে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, জেলা নির্বাচন অফিসার, পুলিশ সুপার বা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের প্রতিনিধি, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীসহ অন্যান্য বাহিনীর মনোনীত কর্মকর্তা থাকবেন।আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেলের কার্যপরিধি: এই সেল নির্বাচনি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে অবহিত করবে।অন্যান্য ব্যবস্থা: ভোটাররা যেন অবাধে ও নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করে সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। নারী ভোটারসহ সব শ্রেণির ভোটারকে নিরাপদে ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাস্তানদের গ্রেপ্তারের নির্দেশও রয়েছে। গোলযোগপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। আচরণবিধি ভঙ্গ, উসকানিমূলক বক্তব্য বা অর্থ ও পেশিশক্তি দিয়ে নির্বাচন প্রভাবিত করার চেষ্টা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।এছাড়াও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ইতোমধ্যে প্রশাসনকে রদ-বদল করে সাজানো হয়েছে। তবুও নির্বাচন কমিশনের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি ইসলামী দল। দলগুলোর নেতারা মনে করছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করে একটা সুষ্ঠ নির্বাচন হোক। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকা দরকার। নিরপেক্ষ ডিসি, এসপিকে নিয়োগ করার কথাও বলছেন তারা। তবে বর্তমান প্রশাসন নিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ।মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আমি তো এখনো আশাবাদী। আমরা যদি কোনো বিচ্যুতি দেখতে পাই, তাহলে আমরা সেভাবে ব্যবস্থা নেব। ঢালাওভাবে তো কিছু না। আমরা সাধারণভাবে মনে করছি তারা (মাঠ প্রশাসন) প্রস্তুত আছেন, যোগ্য আছেন। যদি সুনির্দিষ্টভাবে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়, আমরা অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে বিবেচনা করব।এ প্রসঙ্গে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, প্রশাসন একটি দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না তা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।ডা. আবদুল্লাহ তাহের বলেন, আগামী নির্বাচন অতীতের পাতানো নির্বাচনগুলোর মতো হবে কি না তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। দু-এক সপ্তাহ ধরে সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যেভাবে একটি বিশেষ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে এবং প্রশাসন যেভাবে আনুগত্য দেখাচ্ছে এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ধরনের পাতানো নির্বাচন বাংলাদেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে।ইসিকে দৃঢ় হতে হবে উল্লেখ করে আবদুল্লাহ মো. তাহের বলেন, ইসিকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। অন্যথায় জাতি আপনাকে দায়ী করবে। ইলেকশন কমিশনকে দায়ী করবে। সরকারকে করবে না। আমরা বলেছি নিরপেক্ষ ডিসি, এসপিকে নিয়োগ করতে হবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখন সৃষ্টি হয়নি।জামায়াতের এই নেতা বলেন, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি আমরা আস্থা রাখতে চাই। আমরা যেহেতু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রয়েছি তাই ইসিকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ।তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়েও আমরা শঙ্কিত। নির্বাচনের আগে চিরুনি অভিযান করে অস্ত্র উদ্ধার না করলে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে। আশা করি নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকার কারণে সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার শঙ্কা বলেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, সরকারের বিভিন্ন অংশ একটি নির্দিষ্ট দলের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার পাশাপাশি সামান্য কারণে, সংশোধনযোগ্য মনোনয়ন বাতিল করে রিটার্নিং অফিসাররা প্রার্থীদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন।আতাউর রহমান বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে এবং তাদের প্রধানরা ‘ভিভিআইপি প্রটোকল’ ভোগ করছেন, যা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির পথে বড় বাধা।নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, কিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে এসব ছোটখাটো ত্রুটি ক্ষমা করা হলেও আমাদের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। এটি স্পষ্ট বৈষম্য।নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ওপর জোর দিয়ে আতাউর বলেন, এখনো পর্যন্ত লুট হওয়া সব অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।কমিশন আমাদের জানিয়েছে, ৭০ শতাংশের মতো উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক অবৈধ অস্ত্র রয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে অস্ত্র উদ্ধারের যে গতি থাকা উচিত, এবার আমরা তার চেয়ে কিছুটা কম লক্ষ্য করছি।ভোরের আকাশ/এসএইচ
২ সপ্তাহ আগে
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২(৩ক)(ক) বিধান অনুযায়ী, নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার এক শতাংশ ভোটারের সমর্থন-সংবলিত স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে হয়। যারা সমর্থন করবেন, সেই তালিকায় তাদের স্বাক্ষর বা টিপসই থাকতে হবে। তবে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী ইতিপূর্বে জাতীয় সংসদের কোনো নির্বাচনে সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকলে বা দলীয় প্রার্থী হলে এটা জমা দিতে হবে না। এই বিধানটি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে যুক্ত করা হয় ২০১১ সালে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাইয়ের সময় স্বাক্ষর দানকারী ভোটারকে পাওয়া যায়নি কিংবা তার স্বাক্ষর মিলেনি-এ ধরনের নানা অভিযোগে অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।যাচাই বাছাইয়ের মধ্যদিয়ে মোট ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, এর মধ্যে ৩৬৬ প্রার্থীই স্বতন্ত্র, যা বাতিল হওয়া প্রার্থীর অর্ধেকেরও বেশি, ৫০ দশমিক ৬২ শতাংশ। বাকি ৩৫৭ প্রার্থী বিভিন্ন নিবন্ধিত দলের হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ৪৭৮ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। ৩৬৬ জন বাদ পড়ায় মোট স্বতন্ত্র প্রার্থীর তিন-চতুর্থাংশের বেশি, অর্থাৎ ৭৬ দশমিক ৫৭ শতাংশের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। যদিও গত সোমবার থেকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়া সব প্রার্থীর আপিল আবেদন নিচ্ছেন ইসি। তবে সারা দেশে ৩৬৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হওয়া দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।বিশ্লেষকদের মতে, এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের বিষয়টি নিয়ে বিগত কয়েকটি নির্বাচনের সময়েই অনেক সমালোচনা হয়েছে। এ নিয়ে নানা ধরনের ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন উপ-নির্বাচনে। প্রতিটি নির্বাচন এবং এর মধ্যবর্তী বিভিন্ন উপ-নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের সাথে দেয়া এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর নিয়ে নানা সমস্যা দেখা দেয় বলছেন তারা।এ প্রসঙ্গে এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজীবী বলছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এই এক শতাংশের সমর্থনের বিধানটিই তার মতে আইনসিদ্ধ নয়। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিপাকেও ফেলতেও এ বিধানটির সুযোগ নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে ভোটারের গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। ভোটার কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন বা দেবেন না, এটি একান্তই তার চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।তিনি বলেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ এই নিশ্চয়তা দিয়েছে। আরপিও-এর ১২(৩ক)(ক) বিধানের কারণে ভোটারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুন্ন হচ্ছে। কারণ, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা দাখিল করতে হচ্ছে। বিধানটি সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।এ প্রসঙ্গে মনোনয়ন বাতিল হওয়া এক প্রার্থী আপিল করেছেন। তিনি বলেন, যে তার কাছে মনে হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কৌশল এটি।তিনি আরো বলেন, আমার মতো একজন মানুষের এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরে বিষয়ে অভিযোগ তুলে প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, এটি গুরুতর বিষয়। এ আইনটি পরিবর্তন হওয়া উচিত।এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের যে স্বাক্ষর দরকার, এটি অযৌক্তিক।বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যাদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে তাদের বেশিরভাগই স্বতন্ত্র প্রার্থী। আমরা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্থার কমিশনের পক্ষ থেকে বলেছিলাম, শুধু ৫০০ ব্যক্তির স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা যেন থাকে এবং এ স্বাক্ষরগুলো যেন হলফনামার মাধ্যমে দেয়া যায়। শনাক্তের ক্ষেত্রে স্বাক্ষরকারীদের চাপ প্রয়োগের অভিযোগ আছে। এর মাধ্যমে জালিয়াতির সুযোগ থেকে যায়। সংস্কার প্রস্তাবটি আরপিওতে সংযুক্ত হলে এ ধরনের কারসাজি করার আর সুযোগ ছিল না। দুর্ভাগ্যবশত নির্বাচন কমিশন এটি আরপিতে অন্তর্ভুক্ত করেনি, যে কারণে এ জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।তিনি বলেন, যারা নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তাদের প্রার্থিতা অকারণে বাতিল করা হলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তাদের একটি বিরাট অংশ স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের যে স্বাক্ষর দরকার, এটি অযৌক্তিক।স্বতন্ত্র প্রার্থী বিধিমালা-২০১১ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আসনের মোট ভোটারের এক শতাংশের স্বাক্ষরিত সমর্থন বা টিপসই দাখিল করতে হয়। এই বিধানকে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ 'কালাকানুন' হিসেবে আখ্যা দিলেও, অন্যপক্ষ একে অহেতুক প্রার্থীর ভিড় কমানোর মোক্ষম উপায় হিসেবে দেখছেন।গোপনীয়তা ও সমতার বিতর্ক: সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, গোপন ব্যালটে ভোট দেওয়া যেখানে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, সেখানে নির্বাচনের আগেই সমর্থনের তালিকা প্রকাশ করা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার নীতির পরিপন্থী। এর ফলে ভোটের আগেই আঁচ করা যায় কে কাকে পছন্দ করছেন। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, এই আইনটি সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ এটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে। যেখানে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের এমন কোনো সমর্থন দেখাতে হয় না, সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক করাকে 'হাস্যকর' ও গণতান্ত্রিক দেশে সমতার অভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিকূলতা: এই আইনের কারণে অনেক যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে দাঁড়াতে অনীহা প্রকাশ করেন, আবার অনেকে দাঁড়ালেও নানা আইনি জটিলতায় পড়েন। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসলিম জারার মনোনয়নপত্র এই স্বাক্ষর জটিলতার কারণেই বাতিল হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক দলের বাইরে যারা নতুনভাবে নির্বাচন করতে চান বা যাদের রাজনৈতিক দল নেই, তাদের নিরুৎসাহিত করতেই এই ব্যবস্থার প্রচলন রাখা হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং এই বৈষম্য দূর করতে দ্রুত এই বিষয়ে একটি আইনি নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন।ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেছেন ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া তাসনিম জারা। তিনি বলেন, বলেন, ‘ঢাকা-৯ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম। সেটি গ্রহণ হয়নি। তাই আমরা আপিল করছি এবং আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। আপনারা দেখেছেন, একদম দেড় দিনের মাথায় প্রায় ৫ হাজার মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে আমাদেরকে স্বাক্ষর দিয়েছেন, অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন, নিজেরাই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বুথ করেছেন। তো এইটার প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা আমাদের আইনি লড়াইটা চালিয়ে যাব। যারা সই করেছেন এত অল্প সময়ে, উনারা চান আমি যেন নির্বাচনে কনটেস্ট করতে পারি। তো সেজন্য আমরা আপিল করেছি। এবং আমরা আইনি প্রক্রিয়ার লড়াইটা চালিয়ে যাব।’আপিলে জয় পেয়ে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাসনীম জারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন তার আইনজীবী আরমান হোসেন। গত ৩ জানুয়ারি ঢাকা জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। ওই সময় তিনি বলেছিলন, নির্বাচন কমিশন মনোনয়ন বাতিলের কারণ হিসাবে জানিয়েছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ওই আসনের মোট ভোটারের ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর নিতে হয়। এই এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের চেয়েও আমি প্রায় ২০০ বেশি স্বাক্ষর জমা দিয়েছি। সেখান থেকে নির্বাচন কমিশন ১০ জনের তথ্য যাচাই করতে গিয়েছিলেন, তার মধ্যে ৮ জনের তথ্য সঠিক পেয়েছেন, বাকি ২ জনের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে ওই দুইজন ঢাকা-৯ এর ভোটার নন, ওই দুইজন জানতেন ঢাকা-৯ এর ভোটার তারা। তাদের ঠিকানা খিলগাঁও হলেও এলাকার কিছু অংশ ঢাকার আরেকটি আসনের সঙ্গে যুক্ত।এছাড়া গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী সেন্টু আলী এবং গণঅভ্যুত্থানের নেতা ফাতেমা রহমান বীথির মনোনয়নও তুচ্ছ কারণে বাতিল করা হয়েছে। এছাড়াও নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম, মিজানুর রহমান এবং সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতনসহ ৩৬৬জন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে।ভোরের আকাশ/এসএইচ
২ সপ্তাহ আগে