-->
বিশেষ নিবন্ধ

ছাদখোলা বাসে উল্লাস এবং আগামী...

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ
মুজতবা আহমেদ মুরশেদ
ছাদখোলা বাসে উল্লাস এবং আগামী...

সাফ নারী ফুটবলে চ্যাম্পিয়নের মুকুট নিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখল আমাদের মেয়েরা। তাদের আগমনে সারা দেশের মানুষ আবেগে উদ্বেলিত। এটাই স্বাভাবিক। এর আগে দেশের বাইরে ফুটবল খেলায় কোনো অর্জন নেই। এই প্রথম মেয়েরাই ওড়ালো গৌরবের পতাকা। নেপালে কাঠমান্ডুর দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক নেপালকে হারিয়ে পতপত করে তারা উড়িয়েছে লাল সবুজের পতাকা। অভিবাদন আপনাদের।

দ্বিতীয়বারের মতো সাফ উইমেনস চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে বাংলাদেশের মেয়েরা লড়াই করে বিজয় আনল। এর আগে প্রথমবার ফাইনাল খেলেছে ২০১৬ সালে। সেবার ভারতের বিপক্ষে হেরে যায়। পাঁচবার সাফের মঞ্চে এসে একবার রানার্সআপ, তিনবার সেমিফাইনাল এবং একবার গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল তারা। এমন পরিস্থিতিতে সানজিদা ফেসবুকে লিখেছিল, ‘যারা আমাদের এই স্বপ্নকে আলিঙ্গন করতে উৎসুক হয়ে আছেন, সেইসব স্বপ্নসারথির জন্য এটি আমরা জিততে চাই। নিরঙ্কুশ সমর্থনের প্রতিদান আমরা দিতে চাই। ছাদখোলা চ্যাম্পিয়ন বাসে ট্রফি নিয়ে না দাঁড়ালেও চলবে, সমাজের টিপ্পনিকে একপাশে রেখে যে মানুষগুলো আমাদের সবুজ ঘাস ছোঁয়াতে সাহায্য করেছে, তাদের জন্য এটি জিততে চাই। আমাদের এ সাফল্য হয়তো আরো নতুন কিছু সাবিনা, কৃষ্ণা, মারিয়া পেতে সাহায্য করবে। অনুজদের বন্ধুর এই রাস্তাটুকু কিছু হলেও সহজ করে দিয়ে যেতে চাই।’

আপনারা ভেবেছিলেন, কোচ গোলাম রব্বানীর কঠোর শ্রম এবং বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুনের বীরোচিত অধিনায়কের ভূমিকায় বিজয়ী হলে ইতিহাস হবে রচিত। রুপনা চাকমা, আঁখি খাতুন, মাসুরা পারভীন, শিউলি আজিম, শামসুন্নাহার, মনিকা চাকমা, মারিয়া মান্দা, সানজিদা আক্তার, কৃষ্ণা রানী সরকার, সাবিনা খাতুন, সিরাত জাহানারা আকাক্সক্ষা করেছিলেন চ্যাম্পিয়ন হলে ছাদখোলা বাসে বিমানবন্দর থেকে আপনারা নগরীতে প্রবেশ করবেন। অতঃপর রাজসিকবেশে বিজয়ের ট্রফি হাতে আমাদের মেয়েরা এলেন। তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন এ নগরী রূপ নেবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায়। তাই হলো। আপনাদের সম্মান জানাতে এ নগরী সেজেছে উৎসবে।

সম্মান জানাতে পথের ওপর মানুষের ঢল নেমেছে। পথের দুধার এবং বাড়ির ছাদ কানায় কানায় পূর্ণ। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, ভবঘুরে, খেটে খাওয়া দিনমজুর, উকিল, কেরানি, বাবু সাহেব, করপোরেট অফিসের কর্তাব্যক্তিরা দাঁড়িয়েছেন জানাতে অভিবাদন। ফুলের পাপড়ি ছড়িয়েছেন অনেকেই। মা, মেয়ে, নিরেট গৃহিণী, বাসার কাজে সাহায্যকারী নারীÑ সবাই বাড়ির ছাদে হাজির। করেছেন পুষ্পবৃষ্টি।

খেলা নিয়ে আমাদের প্রচণ্ড আবেগ। খেলায় যে কোনো সাফল্যে আমাদের মানুষেরা হাসেন, কাঁদেন। প্রত্যাশা করেন, এগোবে বাংলাদেশ। কিন্তু যাদের নিয়ে আমরা গর্ব করতে চাই, তাদের ভেতর আমাদের নারী ফুটবলাররা তেমন পৃষ্ঠপোষকতা পান না।

অবাক হতে হয় এত আনন্দের মাঝেই দেশের মানুষ জানতে পেল নারী ফুটবলারদের বেতন বৈষম্যের গল্প! পুরুষ ফুটবলারদের চেয়ে তারা বিস্ময়করভাবে কম বেতন পান। দীর্ঘদিন ধরে বাফুফে ভবনের আবাসিক ক্যাম্পে ৩০-৪০ জন নারী ফুটবলার থাকছেন, সবার জানা। তাদের থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থাই করছে ফেডারেশন, এও ঠিক। কিন্তু তাদের পরিবারের জীবনযাপনের জন্য এই মেয়েরা যে বেতন পায়, তা একেবারেই অল্প। ‘এ+’ ক্যাটাগরিতে বেতন ১২ হাজার, ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ১০ আর ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ৮ হাজার টাকা মাত্র। আর এর বিপরীতে পুরুষ ফুটবল খেলোয়াড়রা লিগে ক্লাবগুলোর কাছে পান ৫০-৬০ লাখ টাকা, সেখানে ক্যাটাগরিভেদে সানজিদাদের পারিশ্রমিক ৪-৫ লাখ টাকা। বেতন বৈষম্যের এ চিত্রের অবসান জরুরি।

এই যে নারী ফুটবল খেলোয়াড়রা দেশের বাইরে সাফল্য অর্জন করলেন, সে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে এ বাহিনীকে সব ধরনের সহায়তা দিতে হবে। ছাদখোলা সংবর্ধনার আয়োজন অনেক বড় ভালোবাসার প্রকাশ। সে সঙ্গে উল্লেখ করতেই হয়, এর মধ্যেই খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক সে জেলার চারজন নারী ফুটবলারকে বিশেষ অর্থ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পঞ্চাশ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নদের দিতে। তবে এটিও সত্য, এসবকিছু হলো ক্ষণিকের আয়োজন। মূলত দরকার স্থায়ী সহায়তা কাঠামো। এ সহায়তার কাঠামোভুক্ত হলো খেলার মাঠ দখলমুক্ত করা, নতুন নতুন অনেক মাঠ নির্মাণ, আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, প্রত্যেক খেলোয়াড়ের থাকার স্থায়ী বাসস্থানে মাথার ওপর ছাদ করে দেয়া এবং অর্থনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধতায় থাকা পিতা-মাতার আর্থিক দৈন্য দূর করতে ব্যবস্থা নেয়া।

বাংলাদেশের নারী ফুটবলকে এগিয়ে নিতে এবারের চ্যাম্পিয়নরা যেমন আগামীর মেয়েদের কাছে মহানায়ক, তেমনি আরো অসংখ্য নারী খেলোয়াড় সৃষ্টি করতে সব প্রতিকূলতার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সরকারকে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করতে হবে অকুণ্ঠভাবে।

লেখক : উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক ভোরের আকাশ

মন্তব্য

Beta version