-->
পদ্মা সেতু

‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক
আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক
‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’
পদ্মা সেতুর মাধ্যমে উপ-আঞ্চলিক, আঞ্চলিক বলয় পেরিয়ে বিশ্ব নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে বাংলাদেশ, বাড়বে কানেকটিভিটি

স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাঙালির সক্ষমতার প্রতিক। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী উচ্চারণের মধ্য দিয়ে এই সক্ষমতার যাত্রা শুরু হয়। রেসকোর্স ময়দানের জনস্রোতে তিনি বজ্রকন্ঠে ঘোষণা করেছিলেন-‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’। পাকিস্তানী শাকসগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ছুড়ে দেওয়া সেই চ্যালেঞ্জের বাস্তব রূপ আজকের পদ্মা সেতু। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের মানুষ আজ সবিষ্ময়ে দেখছে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন-বঙ্গবন্ধু তনয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন জয়ের গল্প। ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের হাতেখড়ির শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাপান সফরকালে তিনি পদ্মা সেতু ও রূপসা সেতুর রূপরেখা তুলে ধরেন। রূপসা সেতু ইতোমধ্যেই বাস্তবায়িত হয়েছে। পর্বতসম বাধা-বিপত্তি মোকাবিলার পর পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন দেখল বিশ্ববাসী। পদ্মা সেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বজ্রবাণী প্রতিধ্বনিত হল আবারো-‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে বাঙালির লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের এ দৃশ্য গর্বের, গৌরবের।

পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পথটা মসৃন ছিল না মোটেও। এই সেতুকে ঘিরে বহু নীলনকশা আঁকা হয়েছে। বোনা হয়েছে ষড়যন্ত্রের জাল। অভিযোগ তোলা হয়েছে দুর্নীতির। ষড়যন্ত্রকারীদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বিশ্বব্যাংকসহ দাতা গোষ্ঠীগুলো। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের এ পর্যায়ে জাপানের রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে ঘোষণা আসছে, আগামীতে পদ্মাসেতুর মত প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপান হবে সহায়ক-সহযাত্রী। একটা কথা স্মরণ করতে চাই-যেসময় পদ্মা সেতু থেকে দাতাগোষ্ঠীগুলো মুখ ফিরিয়ে নেয় সেসময় জাইকার প্রতিনিধি বলেছিলেন, “লিড প্রতিষ্ঠান হিসেবে পদ্মা সেতু থেকে বিশ্বব্যাংক মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় জাইকার পক্ষে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন সম্ভব নয়, তবে আমরা জানি এবং বিশ্বাস করি এখানে দুর্নীতির কোনো ঘটনা ঘটেনি”। অর্থাৎ, সেদিনের জাইকার প্রতিনিধি এবং এখন জাপানের রাষ্ট্রদূতের কথার অদ্ভূত মিল পাওয়া যাচ্ছে-আনিত অভিযোগের গল্প নিছক বানোয়াট। এই সেতরু সফল বাস্তবায়ন সামনের দিনগুলোতে দেশে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের সম্ভাবনার বিষয়ে আমাদেরকে আশাবাদী করে তোলে। একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেলে যখন দেশীয় অর্থায়নে সেতু নির্মাণের কথা ওঠে তখন দেশী-বিদেশী বহু অর্থনীতিবিদ-গবেষক বিপক্ষে মত-যুক্তি দিয়েছিলেন। তবে আজ আমরা দেখছি, তাদের কন্ঠেও ঝরছে প্রশংসার বাণী। বলতেই হয়, হাজারো প্রতিকূলতাকে মাড়িয়ে পদ্মা সেতুর আজকের বাস্তবতার পুরো কৃতিত্ব এই বাংলার মানুষের, আর একজন সাহসী শেখ হাসিনার। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের ভবিষ্যৎবাণীকে পাশ কাটিয়ে দৃঢ় এবং একক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যান রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। যার ফলাফল আজকের পদ্মা সেতু। এখানেই একজন নেতার পরিচয়, এখানেই বিজ্ঞ নেতৃত্বের মুনশিয়ানা। ভিশনারি লিডাশীপের দৃষ্টান্ত এটাই। দূরদর্শীতা এখানেই।

আজকের বাংলায় বাঙালির আলোর মিছিলে পতাকাহাতে সম্মুখসারির নেতৃত্বে আছেন একজন আলোর দিশারী। ‘যতক্ষণ তোমার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ’-বাঙালির এই আত্মবিশ্বাসের প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এরই বাস্তব রূপ পদ্মা সেতু। এই সেতু বিশ্বকে দেখিয়েছে চমক, বাঙালিকে করেছে আত্মপ্রত্যয়ী। এই অর্জন অনন্য। এই অর্জন অসামান্য। অনন্য অর্জনের এই মিছিলে সামিল হয়ে কবিগুরুর কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে আমিও বলতে চাই-“কে ডাকে রে পেছন হতে,/ কে করে রে মানা, /ভয়ের কথা কে বলে আজ,/ভয় আছে সব জানা।”

পদ্মা সেতুর মতো অবকাঠামো দেশের জন্য যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা তুলে ধরছেন এখন স্বয়ং সেই সব অর্থনতিবিদ, বিশেষজ্ঞরা। সেতুর বাস্তব রূপ দেখে প্রশংসা-সক্ষমতার বাণী ঝরছে ষড়যন্ত্রকারী-দুষ্কৃতিকারীরাদের কন্ঠেও। দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশ পদ্মা সেতুর ফলে উপকৃত হবে। শুধুু তাই নয়, উপ-আঞ্চলিক, আঞ্চলিক বলয় পেরিয়ে বিশ্ব নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে বাংলাদেশ, বাড়বে কানেকটিভিটি। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় যোগাযোগ ব্যবস্থা হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ, অর্থের ফ্রেমে এর গুরুত্ব পরিমাপ করা যাবে না। কাজেই পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে বৃহৎ পরিসরে যুক্ত হবে এই বাংলা। এই সেতুকে ঘিরে বাড়ছে অর্থনীতির হিসাবনিকাশও। চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার সাথে সাথে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাবে, এই অঞ্চলের সাথে সাথে বাড়বে জাতীয় প্রবৃদ্ধি। একটা বিষয় আমরা ভুলে যাচ্ছিÑবিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করলে তা ফেরত দিতে হত। কেননা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন কোনো দয়া-অনুদান নয়। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করে পিছিয়ে যাওয়ায় নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে সেতু। এতে বরং আমাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে আত্মশক্তি, আত্মবিশ্বাস। বিশ্বব্যাংকের এই পিছিয়ে যাওয়ার ফলে একটা বিষয় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশ সক্ষম, পারঙ্গম।

পদ্মা সেতু সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধুর বলে যাওয়া কথা স্মরণ করতে চাই। ১৯৭২ সালের ১০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর এক অনুষ্ঠানে দীর্ঘ ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “আমাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। এই দেশের কিছু মানুষ বিদেশের লোককে ভাড়া করে, দাওয়াত করে এই দেশে নিয়ে আসে অপতৎরতা চালাতে। বিদেশে বসে ষড়যন্ত্র চলে”। বঙ্গবন্ধুর সেই কথার বাস্তব চিত্র দেখেছি আমরা পদ্মা সেতুর বেলায়। পদ্মা সেতুকে ঘিরে বিদেশে ষড়যন্ত্র চলেছে। এদেশের একটা গোষ্ঠী দেশে-বিদেশে অপপ্রচার চালিয়ে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্থ করতে চেষ্টা চালিয়েছে। মানতে হবে, একটা সময় পদ্মা সেতুর স্বপ্ন বিবর্ণ হতে শুরু করে, আশা-স্বপ্ন হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয় অর্থায়নের ক্ষেত্রে। শুধু একজন ব্যক্তিই সেসময় পদ্মা সেতুর স্বপ্নকে উঁচিয়ে ধরে রাখেন। তিনি এই দেশের জনগণের জনদরদি নেতা শেখ হাসিনা। তার ঐকান্তিক চ্যালেঞ্জ, প্রচেষ্টার ফসল পদ্মা সেতু। এই সেতু বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন-‘আমরা পারি, আমরাই পারি’। এই সক্ষমতা বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে মর্যাদার আসন, যা আগামীর বিশ্বে দেশকে, দেশের মানুষকে গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে। একটা বিষয় ভালভাবে মাথায় রাখতে হবে, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি জাতি ছিল নিরস্ত্র-নিরন্ন। সেই জাতি ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াই করে ৩০ লক্ষ তাজা প্রাণের রক্ত ঝরিয়ে ছিনিয়ে এনেছে লাল-সবুজের পতাকা। স্বাধীনতার ৫১ বছরে এসেও আমরা দেখলাম সেই একই চিত্ররূপ। অর্থের প্রশ্নে আমরা একা হয়ে পড়েও দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে পদ্মা সেতুর মত স্থাপনা গড়তে সক্ষম হলাম পদ্মার মত প্রমত্তা নদীর বুকে। এই অর্জন যুদ্ধজয়ের সমান। বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত করে গেছেন আপামর বাঙালিকে। সেই ভাষণ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের জনগণ নিজস্ব অর্থ নিয়েই ঝাঁপিয়ে পড়েছে, বাস্তব রূপ দিয়েছে পদ্মা সেতুকে। এই মনোবল, নিজস্ব শক্তিমত্তার প্রতি এই আস্থা বিশ্বজয়ের সমান। যেই ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে বীর বাঙালি অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, যেই ভাষণের আদর্শকে ধারণ করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে, সেই ভাষণকেই লুকিয়ে ফেলার চক্রান্ত চলেছে দুষ্টুমহলে। দুষ্টচক্রের ষড়যন্ত্র, দুষ্কৃতি বন্ধ হয়নি;এই পর্যায়ে এসেও অপতৎপরতায় মত্ত তারা। তাদের কুনজর পড়েছিল বাঙালির স্বপ্নের সেতুতে। তবে বাঙালি দমে যায়নি, শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান করেছে সোনালী স্বপ্ন।

বাঙালির স্বপ্নপূরণের এই ক্ষণে সগর্বে বলতে চাই, ভাগ্যবান বাঙালি জাতি পেয়েছিল একজন মানবিক বঙ্গবন্ধুকে, পেয়েছে একজন মানবিক শেখ হাসিনাকে। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশের মাটিতে পা রেখেই বঙ্গবন্ধু ছুটে যান সাধারণ মানুষের কাছে। সেসময় তিনি পরিবার-পরিজনের কাছে ছুটে যান নি। পাকিস্তানের কারাগারে অনিশ্চয়তার বন্দিজীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেই তিনি ছুটে গেছেন স্বজনের কাছে-জনতার ভুবনে, বাঙালির মিছিলে। একারণেই ইতিহাসের পাতায় সর্বকালের সর্বসেরা বাঙালি হিসেবে অমর হয়েছেন তিনি। বাইশ সালের বাংলাদেশেও আমরা দেখছি একই দৃশ্যÑবাঙালি পেয়েছে এক মহান নেতা, মানবিক প্রধানমন্ত্রী। বিপদে-সংকটে মানুষের দোরগোড়ায় ছুটে যাওয়া এমন দেশনেতা কজন আছে এই বিশ্বে? অথচ দুর্যোগের আঁচ পেলেই সংকাটাপন্ন জনতাকে বুকে জড়ান মানবিক শেখ হাসিনা। শত ব্যস্ততার মাঝেও সাম্প্রতিক বন্যা কবলিত এলাকায় তার ছুটে যাওয়াকে কোন মূল্যে হিসাব করা যায়?

১৫ই আগষ্টকে বাঙালি জাতি ভুলে যায়নি। ২১শে আগষ্টকেও ভুলে যাইনি আমরা। বার বার ষড়যন্ত্র হয়েছে। তবে দিনশেষে মুখ থুবড়ে পড়েছে সকল অপচেষ্টা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার অপচেষ্টা ধূলিস্যাৎ হয়েছে। ২১শে আগষ্টের আঁধার কেটেও ফুটেছে আলোর ঝলকানি। আজকের বাংলায় বাঙালির আলোর মিছিলে পতাকাহাতে সম্মুখসারির নেতৃত্বে আছেন একজন আলোর দিশারী। ‘যতক্ষণ তোমার হাতে দেশ, পথ হারাবে না বাংলাদেশ’-বাঙালির এই আত্মবিশ্বাসের প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এরই বাস্তব রূপ পদ্মা সেতু। এই সেতু বিশ্বকে দেখিয়েছে চমক, বাঙালিকে করেছে আত্মপ্রত্যয়ী। এই অর্জন অনন্য। এই অর্জন অসামান্য। অনন্য অর্জনের এই মিছিলে সামিল হয়ে কবিগুরুর কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে আমিও বলতে চাই-“কে ডাকে রে পেছন হতে,/ কে করে রে মানা, /ভয়ের কথা কে বলে আজ,/ভয় আছে সব জানা।”

লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য

Beta version